Spleen বা প্লীহা কি?
প্লীহা একটি ছোট অঙ্গ যা পেটের উপরীভাগের বামপাশে পাকস্থলির কাছে এবং বুকের পাঁজরের নিম্নদেশে থাকে।
প্লীহার কাজ কী?
অনেকগুলো কাজের মধ্যে প্লীহার গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল রক্তের ছাঁকনি হিসেবে কাজ করা এবং লিম্ফোসাইট (এক ধরনের শ্বেতরক্তকণিকা) তৈরি করা। প্লীহা রক্তের আধার হিসেবেও কাজ করে কারণ এটি কিছু রক্ত স্টোর করে রাখে জরুরী প্রয়োজনের ব্যবহারের জন্য।
ছাঁকনি হিসেবে এটি রক্ত থেকে ক্ষতিকর উপাদান অপসারণ করে ফেলে। থ্যালাসেমিয়া রোগীর ক্ষেত্রে যখন লোহিত রক্তকণিকার (RBC) আয়ু শেষ হয়ে আসে (সাধারণত ৩০-৬০ দিন পর, যেখানে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে লোহিত রক্তকণিকার আয়ু গড়ে ১২০ দিন) তখন তা প্লীহায় আসে এবং প্লীহা একে ভেঙে এর হিমোগ্লোবিনের গ্লোবিন (প্রোটিন) ও হিম (আয়রন) অংশ আলাদা করে ফেলে যেন সেগুলো শরীরে পুনরায় ব্যবহৃত হতে পারে। অন্যদিকে লিম্ফোসাইট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন রক্ত প্লীহায় আসে, রক্তে কোনো রোগের জীবাণু থাকলে লিম্ফোসাইট এন্টিবডি তৈরি করে প্রতিরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে। এভাবে শরীরে কোনো ইনফেকশন হলে প্লীহা বিপদসংকেত পায় এবং ইনফেকশনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
থ্যালাসেমিয়ার কারণে প্লীহায় কী প্রভাব পড়ে?
লোহিত রক্তকণিকা বেশি পরিমানে ভাঙার কারণে এর আয়রন অংশটি অনেকসময় প্লীহাতেই থেকে যায়। এছাড়া অস্বাভাবিক লোহিত রক্তকণিকাগুলো আকারে ছোট হওয়ার কারণেও সেগুলো প্লীহায় আটকে যেতে পারে। এই দুটি কারণেই প্লীহার আকার বড় হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া থ্যালাসেমিয়াতে হিমোগ্লোবিন কম থাকার কারণে শরীর চেষ্টা করে প্রচুর পরিমাণে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে। অপর্যাপ্ত রক্তগ্রহণের কারণে এটি বেশি হয়। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি হয় অস্থিমজ্জায় (Bone marrow)। কিন্তু থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারেনা তাই অন্যান্য অঙ্গ যেমন প্লীহা লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করা শুরু করতে পারে। এই অত্যাধিক সক্রিয়তার কারণে প্লীহার আকার বেড়ে যায় যাকে বলে হাইপারস্প্লিনিজম (Hypersplenism)।
হাইপারস্প্লিনিজম Hypersplenism
প্লীহার আকার বেড়ে যাওয়ার কারণে এটি আরও দ্রুত কাজ করে, আরও বেশি পরিমানে লোহিত রক্তকণিকা ভাঙতে থাকে ফলে হিমোগ্লোবিন আরও কমতে থাকে। ফলস্বরূপ, থ্যালাসেমিয়া রোগীর আরও বেশি পরিমানে রক্তগ্রহণের প্রয়োজন হয়। ঘন ঘন রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে আরও বেশি পরিমান আয়রন ঢোকে এবং বেশি পরিমানে চিলেশনের প্রয়োজন হয়। প্লীহা বড় হলে পেটে ব্যথা হতে পারে, অল্প খেয়েই পেট ভরা অনুভব হতে পারে। আয়রন জমে প্লীহার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে। তবে এরকম কোনো লক্ষণ না-ও দেখা দিতে পারে। অবশ্যই একজন ডাক্তারের তত্ত্বাবধায়নে থাকতে হবে।
করণীয় কী?
প্লীহা বড় হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত যেন তা বড় হতে না পারে। এর উপায় হল শুরু থেকেই পর্যাপ্ত পরিমানে রক্তগ্রহণ করে হিমোগ্লোবিন ৯ এর উপরে রাখা এবং পর্যাপ্ত আয়রন চিলেশন। প্লীহা বড় হয়ে গেলেও পর্যাপ্ত রক্তগ্রহণ করলে আকার হ্রাস পেতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও প্লীহা অপসারণের (Splenectomy) প্রয়োজন হয়, সেক্ষেত্রে একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ প্রয়োজন। অপারেশনের মাধ্যমে প্লীহা অপসারণ করাকে স্প্লিনেকটমি বলে।
স্প্লিনেকটমি অপারেশন কি বিপজ্জনক?
যেকোনও অপারেশনে এবং অজ্ঞান করাতে ঝুঁকি থাকে। তবে রোগীর পরিস্থিতি বিবেচনায় স্প্লিনেকটমি করা অনেকসময় জরুরি হয়ে পড়ে। যেহেতু শরীরে প্লীহার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল রোগ প্রতিরোধ, কাজেই প্লীহা অপসারণ করার পর বাকি জীবন রোগীর ইনফেকশন বা রোগজীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। স্প্লিনেকটমি অপারেশনের পর প্রথম ১-৪ বছর এই ঝূকি বেশি থাকে। কম বয়সী রোগীর ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি তাই পাঁচ বছরে নিচের বাচ্চার স্প্লিনেকটমি করার পরামর্শ দেয়া হয় না।
স্প্লিনেকটমি এর কারণে রোগীর পালমোনারি হাইপারটেনশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই এটি নিয়মিত চেক আপ করতে হবে।
কোনও কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে রোগীর প্লীহা পূর্ণ অপসারণ না করে আংশিক অপসারণ করা হয় যাতে করে ইনফেকশনের ঝুঁকি না বাড়ে, তবে পূর্ণ অপসারণের তুলনায় আংশিক অপসারণ বেশি জটিল এবং কেবল বিশেষ ক্ষেত্রেই আংশিক অপসারণ প্রযোজ্য। তাই সাধারণত পূর্ণ অপসারণের পরামর্শ দেয়া হয়।
ইনফেকশনের ঝুঁকি কমানোর জন্য কী কী করা যায়?
১/ স্প্লিনেকটমি এর আগে এবং পরে কিছু টিকা নিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা, মেনিঞ্জাইটিস, নিউমোনিয়া ইত্যাদির টিকা।
২/ স্প্লিনেকটমি এর পরে রোগ প্রতিরোধের জন্য সারাজীবন পেনিসিলিন জাতীয় এন্টিবায়োটিক খাওয়া, অথবা ডাক্তারের পরামর্শে নির্দিষ্ট সময় (৩-৫ বছর) পর্যন্ত খাওয়া।
৩/ ইনফেকশন সম্পর্কিত যেকোনও শারীরিক অসুবিধা যেমন জ্বর, গলাব্যথা, কাশি, ঠাণ্ডা লাগা, অনীহা, পেশীতে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।
৪/ স্প্লিনেকটমি এর পরে রক্তে প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকার পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে যার কারণে রক্ত জমাট বাধার সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত টেস্ট করে প্লাটিলেট কাউন্ট দেখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে কম ডোজে এসপিরিন ওষুধ খেতে হবে।
যেসব রোগীর স্প্লিনেকটমি করা হয়েছে তারা বেশিরভাগই এই চ্যালেঞ্জগুলো মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে এবং তুলনামূলকভাবে কম অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে।
Source: https://thalassemia.org/files/galleries/Spleen.pdf
লেখাঃ ফারহিন ইসলাম
