বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট (বিএমটি) করলেই থ্যালাসেমিয়া ভালো হবে এই আশা নিয়েই গিয়েছিলাম, সবাই তাই ভাবে। তবে যারা বিএমটি করতে যাবেন তাদের কিছু ব্যাপারে জেনে যাওয়া ভালো।
এছাড়া আমার এই পোস্ট শুধু থ্যালাসেমিয়ানদের জন্য যারা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করার চিন্তা করছেন।
আমি কখনো বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করতে নিষেধ করব না। যার ইচ্ছা সে করবে। তবে কিছু ব্যাপার জানানো প্রয়োজন মনে করছি। আমার নিজের সাথে যেটা ঘটেছে সেটাই বলব। আমার দুর্ভাগ্য ছিল আমি যেসব ডাক্তারের কাছে গেছি তারা সবাই বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট এর কথাই বলেছে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়ার বিএমটি আমাদের দেশে নেই তাই এটার ভয়াবহতা সম্পর্কে তারা হয়ত ওয়াকিবহাল নয়। বিএমটির আগে আমাদের (রোগীর অভিভাবকদের) যেভাবে বোঝানো হয়-
১. তারা আমাদের মাথায় চারমাস/একশত বিশ দিনের একটা ব্যাপার এমনভাবে ঢুকিয়ে দিবে, মনে হবে চার মাসের প্রটোকল শেষ হলে রোগীর তেমন বড় ইনফেকশন হবে না।
২. ইনফেকশন ব্যাপারে বলবে জিভিএইচডি (স্কিন ও গাট), সিএমভি (ব্লাড ও গাট) এবং আরেকটা ভাইরাস ইনফেকশনের কথা।
৩. অরগান ফেইলিউর।
৪. পরিবারে ফুল ম্যাচ ডোনার হলে ভাল। না থাকলে ডোনার প্রতিষ্ঠান থেকে ফুল ম্যাচ ডোনার কালেক্ট করে দিবে। যদি সেখানেও না পায়, তখন হ্যাপ্লো করতে বলবে। সেক্ষেত্রে বলবে হ্যাপ্লোই ভালো।
৫. ফাইন্যান্সিয়াল ব্যাপারে একটা এমাউন্ট বলবে ৪০/৩৫/৩০ হাজার ডলার।
উপরের প্রতিটি কথা তারা এমন ভাবে বলবে, যেন মনে হবে বোনম্যারো করলেই ভালো হয়ে যাবে।
এবার আমার সাথে ঘটা ব্যাপারটা বলি। প্রতিটা পয়েন্ট ধরে ধরে-
১. চার মাস না, আপনার সন্তানের কখন ইনফেকশন হবে তার ঠিক নেই, কারণ আমি বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের গ্রুপে দেখেছি ৫৩৭ দিন পরও আহনাফের যে সমস্যা হয়েছে, একই সমস্যা হয়েছে । আহনাফের ইনফেকশনও চারমাস পরেই হয়েছে। একশত পয়ত্রিশ দিন পর্যন্ত আহনাফ হেঁটে হাসপাতালে গেছে। এখানে বলে রাখি, ওরা যদি প্রটোকল শেষ হওয়ার পর দেশে পাঠাতে পারে, তাহলে এরপর কী হল দেখার কেউ নাই।
২. জিভিএইচডি ও সিএমভির সাথে আরো কত ইনফেকশন হবে তার ঠিক নাই। ব্লাক ফাংগাস ইনফেকশন যেটা থ্যালাসেমিয়া বিএমটিদের হয়। ক্যান্সার বিএমটিদের খুব কম হয়, এর কারণ থ্যালাসেমিয়ানদের আয়রন বেশি থাকে আর ব্লাক ফাংগাস আয়রন পছন্দ করে। এই ইনফেকশন সবচেয়ে ভয়ংকর। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে ব্রেন ডামেজ করবে ও চোখ নষ্ট করে দিবে। এটা আমাকে ইএনটির ডাক্তার বলেছে। EPSTEIN BARR VIRUS (EBV) নামে এক ভাইরাস ইনফেকশন হতে পারে (এটা আমার ছেলে আহনাফের হয়নি)। টিটিপি নামে এক ব্লাড ডিজওর্ডার হতে পারে যার কোন ট্রিটমেন্ট নেই। আহনাফের সাইক্লোস্পোরিন নামে এক মেডিসিন থেকে হয়েছিল যা প্রতিটি বিএমটি রোগীকে দিবে। এটা হলে একদিনে প্লাটিলেট কমে যাবে। পুরো শরীরে ব্লাড জমে যায় ও নাক মুখ দিয়ে ব্লাড পরতে থাকে। পনেরদিন এই বিভৎসতা আমাকে দেখতে হয়েছে। এইটার একটা ইঞ্জেকশন আছে যেটা দিলে ২০-৩০% সম্ভাবনা থাকে ভালো হওয়ার। এই ইঞ্জেকশন তিন থেকে চার মাস দিতে হবে প্রতি সপ্তাহে। দাম বাংলাদেশি টাকায় দুই লাখ ষাট হাজার। আমি যুবরাজ নামে এক বাচ্চাকে দেখেছি পাঁচ মাস দিতে, তারপরও ভালো হয়নি। এছাড়া ব্রিদিং প্রব্লেম হতে পারে যেটা হলে মৃত্যু শেষ ঠিকানা। উপরের সবগুলোই আহনাফের হয়েছিল।
৩. অরগান ফেইলিউর হতে পারে তবে সবার হয় না। আহনাফের একদিন প্রসাবে ব্লাড গেছে পরে ঠিক হয়ে গেছিল। আহনাফের কোন অরগান ফেইল করেনি। যদিও ডেথ সার্টিফিকেট এ মাল্টিপল অরগান ফেইল লিখে দিয়েছে।
৪. চার নং এ কিছুই নেই শুধু আউটসাইড ডোনারের জন্য পে করতে হবে অরগানাইজেশানের রেজিষ্ট্রেশন অনুযায়ী। আহনাফের ইন্ডিয়ান ডোনার ছিল।
৫. সবচেয়ে মানসিক সমস্যায় পরবেন এখানে কারণ আউটসাইড ডোনার হলে ৪০ হাজার ডলার বলবে। এটা আসলে বিএমটি পর্যন্ত। যদি বিএমটিতে কোন সমস্যা না হয় সেক্ষেত্রে এই এমাউন্ট দিয়ে বিএমটি হবে তবে খরচের খাতা খুলবে এর পর। কোনদিক দিয়ে খরচ হবে বুঝতেই পারবেন না। যদি একটা ইনফেকশন হয় তাহলেই বিশাল এমাউন্ট চলে যাবে কারণ প্রতিটি মেডিসিন অনেক দামী। এছাড়া আউটসাইড ডোনার হলে তার জিভিএইচডি হবেই আর জিভিএইচডির ইঞ্জেকশন দিলে সিএমভি হবে। এই ইঞ্জেকশন এতো খতরনাক যে শরীরে কোন মাসলস থাকবে না।
এগুলো ছাড়াও আরো ইনফেকশন হতে পারে, র্যাশ, জয়েন্ট পেইন, ড্রাই স্কিন, ড্রাই মাউথ, জন্ডিস, ডায়াবেটিস, হার্ট ফেইলিউর, থাইরয়েড।
এই ট্রিটমেন্ট এর চারটা বেনিফিসিয়ারি আছে
১. ডাক্তার, যিনি এক্সপেরিয়েন্স গাদার করেন।
২. হাসপাতাল খুব ভালো ব্যবসা করে।
৩. মেডিসিন কোম্পানির ব্যবসা।
৪. ব্রোকার।
আমার নিজের যেটা মনে হয়েছে বা নয় মাস আগে যে কয়জন বিএমটি রোগীদের ব্যাপারে জেনেছি ও দেখেছি, তাদের মধ্যে যাদের ব্লাড ট্রান্সফিউশন হয় নাই বা খুব কম হয়েছে এদের বেশ কয়েকজন ভালো আছে। তবে তাদের ট্রান্সপ্লান্ট কারো পাঁচ বছর হয় নাই। যাদের ব্লাড ট্রান্সফিউশন বেশি হয়েছে তাদের সবারই আহনাফের মতোই সমস্যা হয়েছে ও তারা নেই। আমি দশ মাস হাসপাতালে কোন বিএমটি পেশেন্ট মারা গেছে শুনিনি। যেদিন আহনাফ মারা যায় সেদিন তিনজন বিএমটি পেশেন্ট মারা গেছে এবং এরা সবাই থ্যালাসেমিয়া ও সিকল সেলের রোগি। কিন্তু ওপিডির চিত্র দেখলে মনে হবে হাসপাতালে কোন রোগীই মারা যায়নি, এমন একটা পরিবেশ তৈরি করে রাখে।
হাসপাতালে অনেক দেশের রোগীর সাথেই পরিচয় হওয়ার কারণে দেখতাম হঠাৎ করে কেউ আসত না। তখন ওপিডিতে জিজ্ঞেস করলে বলত দেশে চলে গেছে। পরে বুঝলাম তারা দেশেই চলে গেছে, তবে পায়ে হেঁটে না, আহনাফের মতো কাফিনে করে।
প্রতিটি কাজের পজিটিভ ও নেগেটিভ সাইড থাকে তবে থ্যালাসেমিয়ায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের ব্যাপারে নেগেটিভ না বলে আমি ডার্ক সাইডই বলব। কারন এই ডার্ক সাইড আপনি জানতেই পারবেন না। ডাক্তার বা যারা এই চিকিৎসার ব্যাপারে আগ্রহী করে তুলবে তারা কেউ আপনাকে ইচ্ছা করেই জানাবে না অথবা অনেকে জানেই না এর ডার্ক সাইড।
লেখাঃ আলেয়া ফেরদৌসি (থ্যালাসেমিয়া রোগী আহনাফের মা। আহনাফ বিএমটি-পরবর্তী জটিলতায় ভারতে মৃত্যুবরণ করেছে)
