থ্যালাসেমিয়ায় রক্তগ্রহণ বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন

আলফা বা বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত রোগীদের নিয়মিত রক্তগ্রহণের প্রয়োজন হয়। বিটা থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া বা হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজের রোগীদের মাঝে মাঝে রক্তগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে বা না-ও হতে পারে। ই-বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগীদের নিয়মিত রক্তগ্রহণ প্রয়োজন হতে পারে তবে তা সাধারণত আলফা বা বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত রোগীদের তুলনায় কম। মাঝে মাঝে কোনো একজন রোগীর রক্তগ্রহণের প্রয়োজন পরিবর্তন হতে পারে যেমন যার আগে হঠাৎ রক্তগ্রহণ করতে হত তার বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিয়মিত রক্তগ্রহণ করতে হতে পারে। অন্য কোনো অসুস্থতা বা ইনফেকশন হলেও রক্তগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।

থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত রোগীদের সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ পর পর রক্ত (লোহিত রক্তকণিকা) গ্রহণ করতে হয়। রোগীর ওজন ও রক্তগ্রহণের পূর্বে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ অনুযায়ী রক্ত গ্রহণ করতে হয়। রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ বা হেমাটোলজিস্ট নির্ধারণ করবেন কখন রক্তগ্রহণ (ট্রান্সফিউশন) প্রয়োজন এবং নিয়মিত ট্রান্সফিউশন শুরু করা উচিত কিনা। ট্রান্সফিউশন শুরু করার আদর্শ বয়স একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম, এমনকি একই ধরনের থ্যালাসেমিয়া রোগীদেরও একেক রকম হতে পারে। সাধারণত, আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর শিশুদের মায়ের গর্ভাবস্থা থেকেই ট্রান্সফিউশন প্রয়োজন হয় এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর শিশুদের জন্মের ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে শুরু করতে হয়। প্রথমবার ট্রান্সফিউশন নেয়ার পূর্বেই ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে রোগীর থ্যালাসেমিয়ার ধরণ ও ক্লিনিকাল ক্রাইটেরিয়া নিশ্চিত হয়ে নিতে হবে।

থ্যালাসেমিয়া মেজরে আক্রান্ত রোগীর একবার ট্রান্সফিউশন শুরু হলে সাধারণত হিমোগ্লোবিনের মাত্রা 8.5 থেকে 10 g/dL এর মধ্যে বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ, হিমোগ্লোবিন ৮.৫ এ নামলেই রক্ত নিতে হবে। ৮.৫ এর উপরে রাখার জন্য যতটুকু রক্ত প্রয়োজন ততই নিতে হবে। রক্তের সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ দেখা হয়। (অর্থাৎ রক্ত নেওয়ার আগে বা দুর্বল/ফ্যাকাসে মনে হলে হিমোগ্লোবিন টেস্ট করে দেখতে হবে কখন রক্ত লাগবে। এভাবে কয়েকবার দেখলে একটা রোগীর ক্ষেত্রে ধারণা পাওয়া যাবে যে তার কত ঘন ঘন রক্ত লাগবে বা আদৌ লাগবে কিনা। মনে রাখতে হবে এটি একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম, রোগীর প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তনশীল এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এটি নির্ধারণ করতে হবে।) হার্টের সমস্যা থাকলে হিমোগ্লোবিন আরও বেশি রাখা জরুরি। রক্তগ্রহণের পরে হিমোগ্লোবিন যেন ১৪ এর ওপরে না ওঠে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

রক্তগ্রহণের আগে রোগীর রক্তের নমুনা নিয়ে ডোনারের রক্তের সাথে “ক্রসম্যাচিং“ পরীক্ষা করা হয়। রক্তের ধরন বোঝার জন্য এবং ডোনারের রক্তে বিশেষ কোনো পদার্থের উপস্থিতি যেন রোগীর শরীরে কোনো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না করে সেজন্য এই টেস্ট করা হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সাধারণত প্যাকডসেল (Packed cell) লোহিত রক্তকণিকা (RBC) গ্রহণ করতে হয়, যেখানে শ্বেত রক্তকণিকার (লিউকোসাইট) পরিমাণ যথাসম্ভব কমানো থাকে, কারণ শ্বেত রক্তকণিকার কারণে শরীরে রিয়্যাকশন (প্রতিক্রিয়া) হতে পারে। এছাড়া যাদের ঘন ঘন রিয়্যাকশন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাদের ওয়াশড সেল রক্ত প্রয়োজন হতে পারে। একইসাথে লিউকোসাইট ফিল্টার করার জন্য ট্রান্সফিউশনের সময় ব্লাডসেটের পরিবর্তে বেডসাইড ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে।

ডোনারের রক্তে যদি এমন কোনো প্রোটিন থাকে যা রোগীর শরীর গ্রহণ করতে পারে না, তখন রিয়্যাকশন হয়। রিয়্যাকশনের সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, ঠান্ডা লাগা/কাঁপানো, ত্বকে র‍্যাশ বা এলার্জি, রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব। এগুলি হলে অবিলম্বে ডাক্তার বা নার্স দ্বারা পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসা করাতে হবে। তবে এমনকি ট্রান্সফিউশনের দুই সপ্তাহ পরেও রিয়্যাকশন দেখা দিতে পারে। এমন একটি রিয়্যাকশন হল রক্তকণিকা দ্রুত ভেঙে যাওয়া, যার ফলে জন্ডিস হতে পারে এবং হিমোগ্লোবিন কমে যায়। এক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব ডাক্তার দেখাতে হবে। প্রথম-ডিগ্রী আত্মীয় (First degree relatives) যেমন বাবা, মা, ভাই, বোন, সন্তানের কাছ থেকে রক্ত ​​​​নেয়া যাবে না।

এলার্জি রিয়্যাকশনের ক্ষেত্রে এন্টিহিস্টামিন বা স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ নিতে হয় যেমন এভিল, এলাট্রল বা ওরাডাক্সন ইত্যাদি। অতীতে যদি রিয়্যাকশনের ইতিহাস থাকে তাহলে রক্তগ্রহণের পূর্বেই বা সাথে সাথেই এরকম ওষুধ খেয়ে নিতে বলতে পারেন ডাক্তার।

সূত্র:

1. Guidelines for the Clinical Management of Thalassaemia (TIF)

2. A Guide to Living with Thalassemia (Cooley’s Anemia Foundation)

অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা: ফারহিন ইসলাম

volunteer
Member form
Blood doner