দেহের সুস্থ সবল হাড় প্রত্যেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাড়ের ভর কম থাকা (Low Bone Mass) হাড়ের দুর্বলতা বোঝায়। থ্যালসেমিয়া রোগীদের হাড়ের ভর (Bone Mass) কম থাকতে পারে।
বিভিন্ন কারণে শরীরের হাড়ের ভর কম থাকতে পারে, যেমন জীনগতভাবে পিতামাতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে, নিয়মিত অতিরিক্ত ওজন বহন বা অতিরিক্ত ব্যায়াম ইত্যাদি কারণে। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে হাড়ের ভর কমে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এর পিছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে যেমন থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্তস্বল্পতা, অস্থিমজ্জার (Bone marrow) অতিমাত্রায় সক্রিয়তা (কারণ অস্থিমজ্জায় রক্তকণিকা উৎপাদন হয়) , হাড়ে অতিরিক্ত আয়রন জমা হওয়া, ডেস্ফেরাল (Deferoxamine) ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, এন্ডোক্রাইন গ্রন্থির (হরমোন সংক্রান্ত) বিভিন্ন সমস্যা যেমন দেরীতে বয়োঃসন্ধি হওয়া ও হাইপোগোনাডিজম।
অস্টিওপিনিয়া (Osteopenia) ও অস্টিওপোরসিস (Osteoporosis) কী?
হাড়ের ভর কমে যাওয়াকে অস্টিওপিনিয়া বলে, একটি নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি কমে গেলে তাকে বলে অস্টিওপোরোসিস। এতে হাড় ভঙ্গুর হয়ে যায়। অস্টিওপিনিয়াকে বলা হয় “Reduced bone mass” এবং অস্টিওপোরোসিসকে বলা হয় “Low bone mass”
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির হাড়ের খনিজ ঘনত্ব (Bone Mineral Density- BMD) T-score যদি -1 থেকে -2.5 এর মধ্যে হয় তাহলে সেটি অস্টিওপিনিয়া এবং যদি -2.5 এর চেয়ে কম হয় তাহলে সেটি অস্টিওপোরোসিস।
এতে কী কী সমস্যা হয়?
অস্টিওপোরোসিস-এর কারণে হাড়ের প্রোটিন ও ক্যালসিয়াম কমে যায় এবং হাড় পাতলা হয়ে যায়। হাড়গুলো ছিদ্র ছিদ্র হয়ে ভঙ্গুর হয়ে যায় তাই ওজন বহন করতে পারে না এবং সহজেই ভাঙন/চিড় ধরে (Fracture হয়)। যদি কারো হাড়ের ভর কম থাকে, তার একবার হাড় ভাঙলে সারতে অনেক বেশি সময় নিতে পারে অথবা অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। অস্টিওপোরোসিস আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক কার্যকলাপে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, চলাফেরায় অসুবিধা হয়, এবং কঙ্কালের কাঠামো প্রভাবিত হয়। শরীরের যেকোনো হাড়ই অস্টিওপোরোসিস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে তবে হিপ, মেরুদণ্ড, কব্জি ও পাঁজরের হাড় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
কীভাবে হাড়ের ভর পরীক্ষা করা যায়?
যাদের হাড়ের ভর কম রয়েছে তারা বেশিরভাগই এ সম্পর্কে জানেন না। হাড়ের ক্ষয় কোনও দৃশ্যমান লক্ষণ ছাড়াই দীর্ঘসময় থাকতে পারে। তাই ফ্র্যাকচার না হওয়া পর্যন্ত এটি সাধারণত জানা যায় না। এ কারনে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তদের বয়স ৮ বছরের বেশি হলে নিয়মিত প্রতি বছর Bone Mineral Density (BMD) টেস্ট করা উচিত। BMD এক ধরণের এক্সরে পরীক্ষা যাকে বলে “ডেক্স-স্ক্যান”। এই টেস্টে অস্টিওপিনিয়া ও অস্টিওপোরোসিস নির্ণয় করার জন্য দুই ধরনের স্কোর পরিমাপ করা হয়ঃ T-score এবং Z-score। এর সাথে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি লেভেলও চেক করেন ডাক্তার।
T-score একজন স্বাভাবিক সুস্থ ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তির তুলনায় রোগীর BMD পরিমাপ করে। T-score শূন্য মানে হল রোগীর BMD একজন স্বাভাবিক সুস্থ ৩০ বছর বয়সী ব্যক্তির সমান। T-score শূন্যের চেয়ে বেশি হলে ব্যক্তি স্বাভাবিকের চেয়েও ভালো অবস্থানে আছেন এবং শূন্যের চেয়ে কম হলে স্বাভাবিকের তুলনায় খারাপ অবস্থান।
Z-score একজন স্বাভাবিক সুস্থ রোগীর বয়সী ব্যক্তির তুলনায় রোগীর BMD পরিমাপ করে। যেহেতু থ্যালাসেমিয়ায় স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় অল্প বয়সে হাড়ের ভর কমতে পারে, তাই Z-score থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হাড়ের ভর নির্ণয়ে বেশি তথ্য দিতে পারে।
প্রতিরোধের উপায় কী?
• নিয়মিত পরিমিত রক্তসঞ্চালন। কারণ রক্তস্বল্পতা ও অস্থিমজ্জার অতিসক্রিয়তা হাড়ক্ষয়ের কারণ। হিমোগ্লোবিন সঠিক মাত্রায় রাখলে হাড়ের ভর কমার সম্ভাবনা কমে যায়।
• সঠিক মাত্রায় আয়রন চিলেশন বজায় রাখা। কারণ হাড়ে আয়রন জমলে তা হাড়ক্ষয়ের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
• এন্ডোক্রাইন গ্রন্থিতে (হরমোনজনিত) সমস্যা যেমন বিলম্বিত বয়োসন্ধিতে, হাইপোগোনাডিজম ইত্যাদি থাকলে তার সঠিক চিকিৎসা নেয়া।
• ধূমপান থেকে দূরে থাকা।
• নিয়মিত ব্যায়াম। ডাক্তারের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে ব্যায়াম করতে হবে।
• ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া। ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ কিছু খাবার হলঃ দুধ, দই, পনির। সবুজ পাতাযুক্ত শাকসবজি যেমন ব্রোকলি, ফুলকপি, পালং শাক, শালগম পাতা, বাধাকপি, বক চয় ইত্যাদি। ঢেঁড়স, মটর, বাদাম। ভিটামিন ডি পাওয়া যাবে সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ, মাশরুমে। তবে আয়রনের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। হৃদপিন্ড বা ডায়াবেটিস এর সমস্যা থাকলে খাদ্যগ্রহণের সময় সেদিক বিবেচনায় রাখতে হবে। ভিটামিন ডি এর সবচেয়ে ভালো উৎস সূর্যের আলো।
• ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট খাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়ে আপনার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন।
সূত্রঃ https://thalassemia.org/files/galleries/LowBoneMass1.pdf
লেখাঃ ফারহিন ইসলাম
