আমরা জানি থ্যালাসেমিয়া দুই রকম- আলফা থ্যালাসেমিয়া এবং বিটা থ্যালাসেমিয়া। বাংলাদেশে বিটা থ্যালাসেমিয়া বেশি কমন এবং অন্যান্য হিমোগ্লোবিনোপ্যাথির মধ্যে হিমোগ্লোবিন ই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে আমাদের দেশে আলফা থ্যালাসেমিয়া নেই বললেই চলে। তবে একেবারেই যে নেই তা নয়। এছাড়া বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বিটা থ্যালাসেমিয়ার তুলনায় আলফা থ্যালাসেমিয়াই বেশি দেখা যায়। আজ কথা বলব এই আলফা থ্যালাসেমিয়া নিয়ে।
মানবদেহে আলফা গ্লোবিন চেইন উৎপাদনে জড়িত থাকে ৪টি জিন। এই চারটি আলফা গ্লোবিন জিনের যেকোনো এক বা একাধিক জিন ত্রুটিপূর্ণ বা অনুপস্থিত থাকলে আলফা থ্যালাসেমিয়া হয়। এই হিসেবে আলফা থ্যালাসেমিয়া চার প্রকার হয়:
১/ নিরব বাহক (Silent carrier/ Alpha plus thalassemia carrier): চারটি জিনের মধ্যে একটিতে ত্রুটি থাকে। এই বাহকদের কোনো লক্ষ্মণ দেখা দেয়না, তবে তারা তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মতে থ্যালাসেমিয়া জিন স্থানান্তর করতে পারে।
২/ বাহক (Alpha thalassemia trait/ Alpha zero thalassemia carrier): চারটি জিনের মধ্যে দুইটিতে ত্রুটি থাকে। এই বাহকদের হালকা রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে। সাধারণত কোনো লক্ষ্মণ থাকে না, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মতে থ্যালাসেমিয়া জিন স্থানান্তর করতে পারে।
৩/ হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ (Hb H disease): চারটি জিনের মধ্যে তিনটিতে ত্রুটি থাকে। এই রোগীদের মাঝারি থেকে গুরুতর পর্যায়ের রক্তস্বল্পতা থাকতে পারে এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা লাগে (রক্ত গ্রহণ, স্প্লিন অপারেশন, আয়রন চিলেশন, নিয়মিত চেকাপ)। কারো নিয়মিত রক্ত লাগতে পারে, কারো আবার অনিয়মিত।
৪/ হিমোগ্লোবিন বার্টস সিন্ড্রোম/ আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর/ হাইড্রপ্স ফিটালিস (Hb Bart’s Syndrome/ Alpha Thalassemia major/ Hydrops Fetalis): চারটি জিনই ত্রুটিপূর্ণ থাকে। এরা গর্ভে ভ্রুণ থাকা অবস্থাতেই মারাত্নক রক্তশূন্যতা দেখা দেয় এবং সাধারণত গর্ভেই বা জন্মের পরপরই মারা যায়। এছাড়া গর্ভকালীন মায়ের শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে যেমন উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনি, রক্তপাত এবং সময়ের আগেই প্রসব হয়ে যাওয়া।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির ফলে এই আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর রোগীদের জন্মের আগে ভ্রুণ অবস্থায়ই অথবা জন্মের পরপরই রক্ত দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা যায় বর্তমানে, যদিও আজীবন সেই রোগীর রক্ত লাগবে এবং থ্যালাসেমিয়ার অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও থাকবে। উন্নত কিছু দেশে এইধরনের ভ্রূণতে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টও করা হয়েছে, তবে এই পদ্ধতি এখনো গবেষণার মধ্যে রয়েছে।
আলফা থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত করার পরীক্ষা:
আমরা জানি থ্যালাসেমিয়া শনাক্ত করার জন্য হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস টেস্ট করা হয়। তবে আলফা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে এই টেস্ট দিয়ে অনেক সময় বোঝা যায় না। আলফা থ্যালাসেমিয়ার বাহক এবং Hb H disease এর ক্ষেত্রে হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস টেস্টের রিপোর্টে Hb A2 কম দেখা যেতে পারে। এরকম হলে ডিএনএ এনালাইসিস করে আলফা থ্যালাসেমিয়ার ধরন কনফার্ম হতে হবে। Hb H disease এর ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোফরেসিস রিপোর্টে Hb H বেশি দেখা যেতে পারে। বার্টস সিন্ড্রোমের ক্ষেত্রে নবজাতকের টেস্ট করলে Hb Barts বেশি দেখা যেতে পারে।
অনেকসময় আলফা থ্যালাসেমিয়া থাকা সত্ত্বেও হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস রিপোর্ট নরমাল থাকে। কারো যদি হিমোগ্লোবিন ইলেক্ট্রোফরেসিস রিপোর্ট নরমাল থাকে কিন্তু সিবিসি রিপোর্টে MCV/ MCH কম থাকে তাহলে ডিএনএ এনালাইসিস করে কনফার্ম হতে হবে। তাই সঠিকভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া ডায়াগনোসিস এর জন্য ডিএনএ এনালাইসিস করতে হয়।
সূত্র: থ্যালাসেমিয়া আন্তর্জাতিক ফেডারেশনের (TIF) বিভিন্ন ডকুমেন্টস এবং TIF AI Bot
অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা: ফারহিন ইসলাম
