লিভার (যকৃত) হল শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যা থ্যালাসেমিয়া সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। লিভারের কাজগুলির মধ্যে একটি হল শরীরের যখন প্রয়োজন তখন আয়রন সংরক্ষণ করা। কিন্তু যদি একজন ব্যক্তির শরীরে অতিরিক্ত আয়রন থাকে (ঘন ঘন রক্তসঞ্চালন অথবা অপর্যাপ্ত চিলেশনের কারণে), তখন তা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত আয়রন লিভারে জমা হয়ে এর ক্ষতি করতে শুরু করে, যা ফাইব্রোসিস নামে পরিচিত । অত্যধিক ফাইব্রোসিসের কারণে লিভার সিরোসিস হতে পারে। লিভার সিরোসিস একটি গুরুতর অবস্থা যার ফলে লিভার ফেইলিওর হতে পারে।
থ্যালাসেমিয়া রোগীরা হেপাটাইটিস বি বা সি ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতে পারে, এটিও লিভারের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা। কখনো কখনো, ট্রান্সফিউশনে প্রাপ্ত রক্তে হেপাটাইটিস ভাইরাস থাকতে পারে। সুতরাং, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার কিছুটা ঝুঁকি থাকে। হেপাটাটাইটিসের চিকিৎসা না করা হলে এর মাধ্যমে লিভার ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস হতে পারে।
হেপাটাইটিস ভাইরাসে আক্রান্ত একজন ব্যক্তির কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। তাই সঠিক সময়ে সমস্যা শনাক্ত করার জন্য নিয়মিত স্ক্রীনিং টেস্ট করা গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ওষুধ (যেমন কিছু আয়রন চিলেটিং ওষুধ বা অন্যান্য ওষুধ) লিভারের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে তাই নিয়মিত পরীক্ষা নিরীক্ষা করা প্রয়োজন।
হেপাটাইটিসের সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
• হালকা জ্বর
• মাথাব্যথা
• ক্লান্তি
• বমি বমি ভাব/বমি হওয়া
• ডায়রিয়া
• ক্ষুধা কমে যাওয়া
• পেটে ব্যথা এবং পেট ফোলাভাব
• পেশী ব্যাথা
• জয়েন্টে ব্যথা
• ত্বক চুলকানি
• গাঢ় রঙের প্রস্রাব
• ফ্যাকাশে রঙের মল
• জন্ডিস (চোখ এবং/অথবা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া)
• মেজাজ পরিবর্তন
• রাতে ঘাম হওয়া
সিরোসিসের সাধারণ লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:
• হাতের তালুতে লালভাব
• বুকে, কাঁধে বা মুখে লাল ফুসকুড়ি
• পেট, পা বা পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া (তরল জমা হওয়ার কারণে)
• পেশী ক্ষয়
• ওজন হ্রাস
• ঘন ঘন সংক্রমণ
• ক্লান্তি
• সহজেই ঘা হওয়ার প্রবণতা
• চুলকানি
• ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্তপড়া
• প্রস্রাব বা মলে রক্ত
• স্মৃতি বিভ্রান্তি
• জন্ডিস
কী কী টেস্ট লিভার সমস্যা শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে?
কোন টেস্টটি আপনার জন্য সঠিক হবে তা নির্ধারণ করার জন্য ডাক্তারের সাহায্য প্রয়োজন।
প্রতি তিন মাসে-
– লিভার এনজাইম স্ক্রীনিং (ALT/GGT) নামক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সময় থাকতেই লিভারের সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক হওয়া সম্ভব। এটি লিভারের প্রদাহ পরীক্ষা করে এবং লিভার সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা দেখায়। সাধারণত, প্রতি তিন মাসে এই টেস্ট করা হয়, রোগীর ALT মাত্রা বেশি হলে, প্রতি মাসেও করা লাগতে পারে। একবার মেপে বেশি/কম না দেখে বরং কয়েক মাস অন্তর অন্তর মেপে বাড়ার/কমার ট্রেন্ডটা দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছরে-
কিছু টেস্ট প্রতি বছর করা দরকার। যেমন হেপাটাইটিস A, B এবং C এর টেস্ট। এছাড়াও আরো কিছু টেস্ট হল:
– পেটের আল্ট্রাসাউন্ড
– T2 MRI বাR2/FerriScan (এর মাধ্যমে লিভারে আয়রনের ঘনত্ব (LIC) বোঝা যায়। থ্যালাসেমিয়ায়, LIC 7 বা তার নিচের বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়; LIC 15 এর উপরে হলে তা গুরুতর আয়রন ওভারলোডিং বোঝায়।)
– লিভার বায়োপসি।
কীভাবে লিভারের জটিলতার চিকিৎসা করা যেতে পারে?
লিভারের জটিলতার জন্য আয়রন চিলেশন থেরাপিতে পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে। হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণ থাকলে অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ লাগতে পারে। যদি অবস্থা ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস পর্যন্ত অগ্রসর হয়, তবে তা সারানো কঠিন; কিন্তু ভবিষ্যতে যেন আরও ক্ষতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
লিভারের জটিলতা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
লিভারের জটিলতা প্রতিরোধের জন্য দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সঠিক আয়রন চিলেশন থেরাপি বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য সমস্যার প্রাথমিক সতর্কতা লক্ষণগুলি শনাক্ত করতে নিয়মিত পরীক্ষা করা।
এছাড়াও, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সমস্ত অ্যালকোহল গ্রহণ বন্ধ করবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং খাদ্যতালিকা মেনে চলবেন, প্রচুর পানি পান করবেন।
সূত্র: A Guide to Living with Thalassemia (Cooley’s Anemia Foundation)
অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা: ফারহিন ইসলাম
