থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য হার্টে (হৃৎপিণ্ডতে) সমস্যার কারণ কী?
থ্যালাসেমিয়ায় হার্টের সমস্যার দুটি প্রধান কারণ রয়েছে: (১) আয়রন ওভারলোড (শরীরে অতিরিক্ত আয়রন জমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত চিলেশন না করা) এবং (২) হিমোগ্লোবিন খুব কম মাত্রায় বজায় রাখা (নিয়মিত ব্লাড ট্রান্সফিউশন গ্রহণ না করার ফলে)।
আয়রন ওভারলোড থ্যালাসেমিয়াতে হার্টের সমস্যার সবচেয়ে কমন কারণ। যদি অতিরিক্ত আয়রন হার্টে জমা হয়, তবে এটি হার্টের সংকেত পরিচালনা করার ক্ষমতাতে হস্তক্ষেপ করতে পারে, যার ফলে অ্যারিথমিয়া হয়। অ্যারিথমিয়া হল অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (হার্টবিট)।
ট্যাকিকার্ডিয়া হল এক ধরনের অ্যারিথমিয়া — যখন হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত হয় (সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটে ১০০ বিটের চেয়েও দ্রুত)। প্রত্যেকের হার্ট বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গতিতে স্পন্দিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি নার্ভাস বা আতঙ্কিত বোধ করেন তবে আপনার হার্ট স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত স্পন্দিত হতে পারে। কিন্তু যদি আপনার হৃদস্পন্দন সাধারণ অবস্থাতেই স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হয় তবে তা অস্বাস্থ্যকর। এটি হার্টকে ক্লান্ত করে দিতে পারে এবং হার্টকে বড় করে তুলতে পারে। আপনার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা যদি খুব কম হয়, তাহলে আপনার শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাবে না। আপনার হার্ট দ্রুত ধাক্কা দিয়ে অক্সিজেনের এই অভাব পূরণ করার চেষ্টা করতে পারে, যার ফলে ট্যাকিকার্ডিয়া হতে পারে এবং হার্টের আকার বেড়ে যেতে পারে।
ব্র্যাডিকার্ডিয়া হল আরেক ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন — যখন হৃদস্পন্দন খুব ধীর হয় (সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিটে ৬০ বিটের চেয়েও কম)। এছাড়াও আরো কিছু ধরনের অনিয়মিত হৃদস্পন্দন রয়েছে যেমন হঠাৎ স্বাভাবিক হঠাৎ খুব দ্রুত আবার হঠাৎ খুব ধীর। এরকম যে কোনো ধরনের অ্যারিথমিয়া হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াকে কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর বলে এবং এটি খুবই বিপজ্জনক, যদিও এটি যথেষ্ট তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে আয়রন চিলেশন দ্বারা সংশোধন করা যেতে পারে।
হার্টের সমস্যার লক্ষণগুলি কী কী?
নিম্নলিখিত সাধারণ লক্ষণগুলি দেখা দিতে পারেঃ
• শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে অসুবিধা (কখনও কখনও, এমনকি যখন আপনি বিশ্রাম করছেন)
• সমতল শুয়ে থাকতে না পারা (চেয়ারে শুতে হবে বা বালিশ দিয়ে শুতে হবে এমন)
• বুক ধড়ফড়
• বুকে ব্যথা
• অজ্ঞান হওয়া
• খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া
• পায়ে বা গোড়ালির চারপাশে ফোলাভাব
• ওজন বৃদ্ধি
• বমি বমি ভাব এবং কখনও কখনও বমি (এটি কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিউর নির্দেশ করতে পারে)
কখনো কখনো কোনো লক্ষণ না-ও দেখা দিতে পারে। এজন্য থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত হার্ট পরীক্ষা করানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেন ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আগে থেকেই সতর্ক হওয়া যায়।
নিম্নলিখিত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষাগুলি সম্ভাব্য হার্টের সমস্যাগুলি সনাক্ত করতে সহায়তা করে, এগুলো প্রতি বছর করানো উচিতঃ
1. ইকোকার্ডিওগ্রাম বা ইকো- এটি হার্টের প্রতিটি চেম্বারের আকার এবং হার্টের অংশগুলি কতটা ভালভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করে।
2. কার্ডয়াক এমআরআই (T2*)- T2* দিয়ে আয়রনের পরিমাণ বোঝা যায় এবং এই আয়রন হার্টের কার্যকারিতাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে তা ডাক্তার বুঝতে পারেন। সাধারণভাবে, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য কাঙ্ক্ষিত T2* স্কোর হল 20 মিলিসেকেন্ড বা তার বেশি। 10 থেকে 20 এর মধ্যে থাকলে মাঝারি এবং 10 এর নিচে থাকলে গুরুতর কার্ডিয়াক আয়রন লোডিং বোঝায়।
3. ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম (বা ইসিজি)- এটি অ্যারিথমিয়া শনাক্ত করতে কার্যকর।
4. বুকের এক্সরে- হৃদপিণ্ড বড় হয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করতে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
কার্ডিয়াক (হার্ট) জটিলতাগুলি কীভাবে চিকিৎসা করা হয়?
আয়রন ওভারলোডের জন্য চিকিৎসা করাই হার্টের সমস্যার চিকিৎসার প্রধান উপায়, অর্থাৎ পর্যাপ্ত আয়রন চিলেশন থেরাপি নিতে হবে। অন্যান্য চিকিৎসার মধ্যে খাদ্যতালিকার পরিবর্তন এবং অন্যান্য ওষুধ থাকতে পারে।
হার্টের সমস্যা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
হার্টের সমস্যা হওয়ার পরে চিকিৎসা করার চেয়ে আগেই প্রতিরোধ করা ভাল।
হার্টের সমস্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হল থ্যালাসেমিয়া বিশেষজ্ঞের দ্বারা নির্ধারিত উপযুক্ত চিকিৎসা বজায় রাখা – অর্থাৎ পর্যাপ্ত আয়রন চিলেশন থেরাপি এবং হিমোগ্লোবিনের মাত্রা যথেষ্ট বেশি রাখা। প্রতিরোধের আরেকটি বড় উপায় হল উপযুক্ত পরিমাণে ব্যায়াম করা, যেমন হতে পারে নিয়মিত হাঁটা। এছাড়াও, ধূমপান ও মদ্যপান না করা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও উপযুক্ত ওজন বজায় রাখা, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েড সমস্যার চিকিৎসা করানো, মানসিক চাপ এড়ানো এবং সবসময় ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রাখা (ভালো চিন্তা করা)।
পালমোনারি হাইপারটেনশন কী এবং এটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের কীভাবে প্রভাবিত করে?
পালমোনারি হাইপারটেনশন হল একটি বিশেষ ধরনের উচ্চ রক্তচাপ যা ফুসফুসগামী ধমনীকে প্রভাবিত করে। এই ধমনী সরু হলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে হার্ট ফেইলিওর হতে পারে। থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের যাদের হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কম থাকে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত নেয় না তাদের পালমোনারি হাইপারটেনশন হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। যেসব রোগীদের প্লীহা অপসারণ করা হয়েছে তারাও বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করা হয়। এছাড়া আয়রন ওভারলোডের কারণে পালমোনারি হাইপারটেনশন আরও গুরুতর হতে পারে।
পালমোনারি হাইপারটেনশনের লক্ষণগুলির মধ্যে আছে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, বুকে ব্যথা, মাথা ঘোরা এবং অজ্ঞান হওয়া। কিন্তু কখনও কখনও, থ্যালাসেমিয়ায় পালমোনারি হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের কোনও লক্ষণই থাকে না। সেই কারণে, প্রতিবছর নির্দিষ্ট কিছু স্ক্রীনিং পরীক্ষা, যেমন ইকোকার্ডিওগ্রাম করা গুরুত্বপূর্ণ যাতে দ্রুত অবস্থা শনাক্ত করে অবিলম্বে চিকিৎসা শুরু করা যায়।
মোট কথা, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের হার্টের সমস্যা প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপায় হল সঠিকভাবে রক্তগ্রহণ করে হিমোগ্লোবিনের সঠিক মাত্রা বজায় রাখা এবং চিলেশন থেরাপির মাধ্যমে শরীরের আয়রন ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ করা।
সূত্র: A Guide to Living with Thalassemia (Cooley’s Anemia Foundation)
অনুবাদ, সংকলন ও সম্পাদনা: ফারহিন ইসলাম
